হঠাৎ করেই অফিসের কাজে চুয়াডাঙ্গা যাচ্ছি। এই বার ই প্রথম না এর আগেও ২০১৭ সালে ইনটার্নশিপ এর জন্য গিয়েছিলাম এবং লাইফের স্মরনীয় ১৫ দিন সেখানে অতিবাহিত করেছিলাম।
তাই যাওয়ার সময় DGM স্যার এর গাড়িতে বসে বার বার সেই দিনগুলি চোখে ভাসছিলো। স্যার এর সাথেও কিছুটা গল্পও করে ফেললাম সেই দিনগুলি নিয়ে।
ভাবতে ভাবতে কুষ্টিয়া চলে আসলাম। যতই কাছে যাচ্ছি ততই স্মৃতি ভেসে আসছে দ্রুত বেগে। বন্ধুদের সাথে কুষ্টিয়ার লালন এর মাজার ঘুরে আসার কথা মনে হতেই হারিয়ে যাচ্ছিলাম সেই দিনগুলিতে। প্রায় ৫ বছর আগের দিনগুলি মনে হচ্ছিলো এইতো সেদিন।
কুষ্টিয়াতে গিয়ে নেমে পড়লাম স্যার এর গাড়ী থেকে। স্যার যাবেন যশোর ফিড মিল এ। আমি যাব চুয়াডাঙ্গায় একটা হ্যাচারী ভিজিট করতে।
স্যার এর গাড়ী থেকে নেমেই সিগারেট ধরালাম। সিগারেট খাওয়া ধরার পর থেকে এক অদ্ভুত নিয়ম হয়ে গেছে যেকোনো জার্নির পর বাস বা যেকোনো যানবাহন থেকে নেমেই সিগারেট ধরাতে হবে।
এর একটা পজিটিভ ইনফ্লুয়েন্স আছে বলে আমার মনে হয় এই যেমন সিগারেট টা ধরালেই মনে হয় যে আমার সাথে কেউ আছে আর একটা ফিল কাজ করে যে, জায়গা আর অপরিচিত লাগে না। আবার আশে পাশে কেউ এভাবে সিগারেট টানতে দেখলে সহজে বুঝতেও পারে না যে আমি এখানকার নাকি অন্য জায়গা থেকে আসছি।
আমি আপন মনে সিগারেট টানতে টানতে হাটছি আর ভাবছি এক সময় এই সিগারেট এ দুই টান না দিতেই পাশ থেকে আওয়াজ আসতো এই ফার্স্ট কল আমার,তুই খাওয়ার পর আমাকে দিস,এই বেটা কত টানিস। তখন দুই টান বেশি না দিতে পারার আফসোস আজকে হওয়ার চান্স নাই, কারন আজ কেউ আমার কাছে চাওয়ার মত নাই। তবে আজকে আফসোস পাশে সেই সিগারেটের ভাগ নেওয়ার বন্ধুরা পাশে নাই।
সিগারেট টানার ফাকে এক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম চুয়াডাঙ্গার বাস কোন দিক দিয়ে যায়। বাস চলে আসছে উঠে পরলাম।
সচরাচর বাস জার্নি তে আমি ১৫ মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি, কারন বাস এ জেগে থাকলে আমার ভালো লাগে না। এমনকি বাসে পাশে বন্ধু থাকলেও আমার বেশি কথা বলতে ভালো লাগে না। ভালো লাগা, না লাগা তার চেয়ে বড় কথা আমার ঘুম চলে আসে।
এই বাসে ঘুমানো নিয়ে বিড়ম্বনার ও কমতি নেই। কলেজে পড়া অবস্থায় মাঝে মাঝে ফার্মগেট থেকে কোচিং শেষে মহাখালী যাবার সময় এমন ঘুম দিতাম বাস মহাখালী পার হয়ে আব্দুল্লাহপুর শেষ বাস স্টপে চলে যেত,হেল্পার বা সুপারভাইজার এর ধমকে ঘুম ভাংত এই ভাই আপনি নামবেন না
।একবার ত নওগাঁ থেকে বাস এ উঠছি ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে, বগুরা এসে ঘুম ভেংগে দেখি সাইনবোর্ড এ বনানী লেখা আমি বাগ নিয়ে নেমে পড়তে যাচ্ছি ভাবছি ঢাকা পৌছে গেছি।হেল্পার বলে ভাই নামেন কান এখানে বাস বেশিক্ষন থামবে না তখন বুঝতে পারলাম এইটা বগুরা বনানী ঢাকা না। লজ্জায় পড়ে গেছিলাম। সাধারণত দুই থেকে তিন বার ঘুম ভাংলেই আমি ঢাকা পৌছে যায়। ঘুমাইলে সবচেয়ে বড় সুবিধা জ্যামে আটকা থাকলেও আমি টের পাইনা আর বিরক্ত ও কম লাগে। তাছাড়া বাস জার্নি বাস ভালো হলে আমার ভালোই লাগে।
কিন্তু আজ আমার ঘুম আসছে না। বার বার ই সেই ফেলে আসা ১৫ দিনের কথা মনে ভাসছে।
চুয়াডাঙ্গায় পৌছে নামলাম একাডেমি মোড় এ। এই জায়গা গুলো আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছিলো যেদিকে তাকাচ্ছিলাম মনে হচ্ছিলো এই যে এইখানে আমরা ঘুরছিলাম, এই পুলিশ পার্কে আমরা গেছিলাম। আসলে আমরা যে ইনটার্নশিপ এ গেছিলাম মনে হয়েছিলো টূর এ গেছিলাম।
কাছের বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন সময় এক সাথে রাত কাটানো হলেও অনেক ক্লাস মেট ছিলো যাদের সাথে খুব বেশি সময় ধরে আড্ডা দেওয়া বা রাত কাটানো হয়ে উঠে নি কিন্তু সেইবার সে সুযোগ হয়েছিলো।সেই বার বিভিন্ন জনকে আলাদা ভাবে দেখেছিলাম আর মনে হয়েছিলো যে আসলে দূর থেকে একজন কে তার আসল টা বুঝা যায় না কাউকে প্রকৃতপক্ষে চিনতে হলে তার সাথে অবশ্যই মোটামুটি কিছু সময় একসাথে কাটাতে হবে।
দিনে বিভিন্ন প্রাক্টিকাল ক্লাস করা লাগলেও রাতটা ছিলো আনন্দে ভরপুর। বন্ধু সকাল নতুন নতুন বংশী বাজানো শিখছে খুব ভালোভাবে না শিখলেও আমাদের বেসুরা গলার গানের মাঝে তার বাশির সুর যেন অমৃত এর মত শুনাচ্ছিলো। রাতে খাওয়ার পর ই সবাই ছাদে চলে আসত আর সকাল কে বলা হত তোমার বাশি টা নিয়ে আসো।
সকাল কে প্রতিদিন বলা হলেও সে প্রতিদিন ই বাশি না নিয়ে ছাদে যেত এবং কেউ যখন বলত তখন আবার নিচে গিয়ে নিয়ে আসত। আমার মনে হয় সবাই যখন বলত বন্ধু তোমার বাশি টা বাজাও সে এইটা ইনজয় করতো। আর না হয় নতুন শিখতেছে বলে হেজিটেট ফিল করতো। কিন্তু আসলে নতুন হলেও সে খুব ভালো বাশি বাজাতো। সময় এর সাথে সাথে কেটে গেছে হাজারো দিন। সে কি এখন বাশি বাজায়, নাকি তাও জানিনা,হইতো তার পর থেকে আর কেউ তাকে এভাবে আর বাশি বাজাতেও বলে নি।
আসলে বাস্তবতা এমন যে আমরা অনেকের কথায় মনে করি কিন্তু কল বা খোজ নেওয়া হয়ে উঠে না। যাইহোক যে যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক এইটাই চাওয়া।
এসব গান বাজনা যে সবার ভালো লাগত তাও না কারো কারো ভয় ও লাগতো এসব আবার স্যারদের কাছে কমপ্লেন যায় কিনা তা নিয়ে।
আমাকে আর নিরব কে নিয়ে অনেকের ভয় ও ছিলো তারা ভাবতো আমরা দুজন এই গ্রুপে থাকলে মার্ক কম আসবে এদের দিয়ে বিশ্বাস নাই।
আমরা ছিলাম ওয়েভ ফাউন্ডেশন এ। সেখানকার খাবার এর কথা আর কি বলব খাবার এত ভালো যে একেকজন খেয়ে খেয়ে ওজন মাপত কই কেজি খাইলাম।কি আর করার জব্বার এর মোড় এর এক পিস মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে ৪ বছর কাটানো পাবলিক আমরা হঠাৎ ভালো খাবার পেয়ে সবাই সবার সর্বোচ্চ দিয়ে খাইতাম।
এসব ভেবে ভেবে অটোতে বসে বসে একা একাই মনে মনে হাসতেছিলাম।
এসব স্মৃতি মনে ভাবতেই ভাবতেই পৌছে গেলাম হ্যাচারীতে।
এতক্ষন যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম হ্যাচারীতে পৌছে ঘোর টা কাটল এখন আর এসব ভাবার সময় নেই ঘোর পালটে চলে গেলাম মুরগীর বাচ্চার জগতে। এখন ভাবনা শুধুই বাচ্চাদের নিয়ে।
জীবনে কিছু কিছু স্মৃতি মনে দোলা দিয়ে আনন্দে ভরে তুলে আবার বাস্তবতায় ফিরিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস উপহার দিয়ে হারিয়ে যায়।